সর্বকালের সেরা দশজন গলফ খেলোয়াড়

কথিত আছে যে, গলফ হলো কোটিপতিদের খেলা। মূলত ইংরেজিভাষী এবং বিভিন্ন ধনী দেশগুলোই যেন এ খেলায় বেশি অংশগ্রহণ  করে থাকে। যেমন যুক্তরাজ্য , যুক্তরাষ্ট্র ,দক্ষিণ আফ্রিকা ইত্যাদি। তবে ইদানীং  চীন ,বাংলাদেশ,ভারতেও গলফ খেলা হচ্ছে। বলকে ”ক্লাব” এর সাহায্যে “হোল” এ ফেলাই হলো গলফের সারসংক্ষেপ। উল্লেখ্য, গলফ খেলায় যে লাঠি ব্যবহার করা হয় তাকে “ক্লাব” বলে এবং যে নির্দিষ্ট গর্তে ফেলতে হয় তাকে “হোল” বলে।

১৯৫৪ সাল থেকে টুর্নামেন্ট শুরু হওয়া এই খেলায় এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের  আধিপত্যই বিরাজমান। যুক্তরাষ্ট এ পর্যন্ত মোট ২৪ বার চ্যাম্পিয়নস এবং ৯ বার রানার্স আপ হয়েছে। ছয়বার চ্যাম্পিয়নস হয়ে এরপর আছে দক্ষিণ আফ্রিকা। গলফ অন্যান্য খেলা থেকে অনেক ভিন্নধর্মী একটি খেলা। গলফ মাঠের সাধারণত কোনো আকার আয়তন নেই। মাঠের আকার ১০০ থেকে ২০০ একরের মধ্যে   হয়ে থাকে, যাকে  বলা হয় গলফ কোর্স। ফুটবল , ক্রিকেট খেলায় ১১ জন মিলে একটা দেশের পতাকা বহন করলেও গলফ খেলায় মাত্র একজনকেই একটা দেশের পতাকা বহন করতে হয়। প্রতি বছর বিভিন্ন গলফ টুর্নামেন্ট হয়ে থাক। যেমন , ওয়ার্ল্ড গলফ চ্যাম্পিয়নশিপ, দুবাই, ইউরোপিয়ান ট্যুর ,মেজর চ্যাম্পিয়নশিপ ইত্যাদি। এসব টুর্নামেন্টের ভিতরে মেজর চ্যাম্পিয়নশিপ সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ। প্রতিটি খেলাতেই সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচন করা অনেক কঠিন কাজ। তবুও বিভিন্ন খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স  , ট্রফি সংখ্যা ও বয়সের উপর ভিত্তি করে সেরা খেলোয়াড় নির্বাচন করা হলো। চলুন আজ দেখে আসি সর্বকালের সেরা ১০ জন গলফারের পরিচিতি।

১০. ফিল মিকেলসন

পিজিএ ট্যুর চ্যাম্পিয়নশিপ হাতে ফিল নিকোলাস । source:pgatour.com.com

গলফ ইতিহাসে সবচেয়ে দ্রুতগতির খেলোয়াড় হলেন ফিল মিকেলসন। তিনি ইউএস রেকর্ড-১১ রাইডার দলের সদস্য । ১৯৯৫ সালে ওয়াক হিলে মিকেলসন তার অভিষেক ম্যাচ খেলেন এবং একই সাথে সব ধরনের দলে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেন। মিকেলসন ২০০৪ সালে মাস্টার্সে তার প্রথম মেজর জিতেন। মিকেলসন ২০১৮ সালের মার্চ মাসে তার ৪৮ তম জন্মদিনে পূর্ব বছরের পিজিএ চ্যাম্পিয়ন ২০১৭; জাস্টিন থমাসকে পরাজিত করে ২০১৮ সালের ডব্লিউজিসি মেক্সিকো চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে নেন। এ পর্যন্ত ফিল মিকেলসন ৪২টি  পি জি এ ট্যুর জয় করছেন। মেজর  জয় করেছেন মোট ৫ টি। যার ভিতরে ২০০৪, ২০০৬ ও ২০১০ সালে  মাস্টার্সে তিনটি। ২০১৩ ওপেন চ্যাম্পিয়নশিপে একটি এবং  ২০০৫ সালে পিজিএ চ্যাম্পিয়নশিপে একটি মেজর জিতেছিলেন।

৯. জিন সারাজেন

মাঠে বসে আছেন জিন সারাজেন ; source:getty image

প্রথম ক্যারিয়ার গ্র্যান্ড স্ল্যাম বিজয়ী, সারাজেন ১৯২০ থেকে ১৯৩০-এর দশকে তার ক্যারিয়ারের সেরা বছর কাটিয়েছিলেন। মাত্র ১৯ বছর বয়সে তিনি প্রথম পেশাদার শিরোপা জিতেন। এরপর সারজেন ১৯২২ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে মার্কিন ওপেন ও পি জিএ  চ্যাম্পিয়নশিপ উভয়ই জিতেছিলেন। ৭১ বছর বয়সে ,১৯৭৩ সালে সারজেন  ওপেন চ্যাম্পিয়নশিপের সময় হোলের পাশে পোস্টেজ স্টাম্প বসানোর পদ্ধতি তৈরী করেন। এছাড়াও আধুনিক গলফে স্যান্ড উইডেজ , গলফ ব্যাগ তার দ্বারায় উদ্ভাবিত। সারজেন মোট ৩৯ টি পিজিএ ট্যুর জিতেছিলেন এবং ৭ বার তিনি মেজর চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছিলেন। যার মধ্যে ছিল , ১৯৩৫ সালে মাস্টার্স ,১৯৯২ ও ১৯৩২ সালে ইউএস ওপেন চ্যাম্পিয়নশিপ। ১৯২২ , ১৯২৩ ও ১৯৩৩ সালে তিনি পিজিএ চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেন।

৮.গ্যারি প্লেয়ার

শর্ট নেওয়ার পর বলের দিকে চেয়ে আছেন গ্যারি প্লেয়ার ; source:hkgolfer.com

  দক্ষিণ আফ্রিকার গলফার গ্যারি ২৪ বার পিজিএ ট্যুর এবং ৭২ বার আফ্রিকান সানসাইন ট্যুর জেতার পর ব্ল্যাক নাইট হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।  ছয় দশক ধরে ছয়টি মহাদেশে ১৬৫ টি টুর্নামেন্ট জেতার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৪ সালে তিনি  বিশ্ব গলফের  হল অফ ফেমে অন্তর্ভুক্ত  হয়েছিলেন। তিনি ক্যারিয়ারের গ্র্যান্ড স্ল্যাম অর্জনকৃত জন্য পাঁচজন খেলোয়াড়ের মধ্যে একজন। নন   আমেরিকান হিসেবেও  তিনি সর্বোচ্চ মেজর বিজয়ী খেলোয়াড়। তার ক্যারিয়ারে তিনি মোট ২৪ টি পিজিএ ও  ৯টি মেজরস  জিতেছেন। যার মধ্যে মাস্টার্স কাপ জিতেছেন তিনবার , একবার ইউএস ওপেন , তিনবার ওপেন চ্যাম্পিয়নশিপ ও দুইবার পিজিএ  চ্যাম্পিয়নশিপ। 

৭. আর্নল্ড প্লেমার 

শর্ট নিচ্ছেন আর্নল্ড প্লেমার ; source: vavel.com

রাজা আর্নল্ড প্লেমার পঞ্চাশের দশকের শুরুতে খেলাধুলার টেলিভিশনে সুপারস্টার তারকা ছিলেন। সে দশকে তার মতো সুপারস্টার তারকা আর কেউ ছিলনা। তিনি শুধু গলফারই নন, একজন জনপ্রিয় কবিও ছিলেন। ১৯৫৫ সালে প্লেমার তার প্রথম পিজিএ ট্যুর জয় করেন। সর্বশেষ ১৯৭৩ সালে পিজিএ চ্যাম্পিয়নশিপ জয় করছিলেন। প্লেমার  মাত্র ৬ বছরে  সাত সাতটি মেজরস জিতেন। তিনি তার ক্যারিয়ারে  মোট ৬২ টি পিজিএ ট্যুর চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছেন এবং মেজরস জিতেছেন মোট সাতবার। যার মধ্যে ছিল চারটি মাস্টার্স চ্যাম্পিয়নশিপ , একটা ইউএস ওপেন ও তিনটি ওপেন চ্যাম্পিয়নশিপ।

৬. বেন হোগেন

ইউএস ওপেন চ্যাম্পিয়নশিপে খেলছেন হোগেন ; source:pixels.com

বেন হোগেন দ্যা হোক নামে পরিচিত ছিলেন।  ১৯৫৩ সালে ওপেন চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের মধ্যে দিয়ে তিনি ক্যারিয়ারের গ্র্যান্ড স্ল্যাম সমাপ্ত করেন । ১৯৫৩ সাল বেন হোগেনের জন্য “দ্য ট্রিপল ক্রাউন” বছর হিসেবে পরিচিত। কারণ সে বছর তিনি ছয়টি  প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহন করে পাঁচটিতেই জয়লাভ করেন। যার তিনটি ছিলো মেজর চ্যাম্পিয়নশিপ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হোগেন ইউলিটির পাইলট হিসেবে সেনাবাহিনী যোগ দেন। সে যুদ্ধের সময় তিনি দুর্ঘটনায় মারাত্মক অসুস্থ হয়ে যান এবং ডাক্তাররা বলেন যে,  তিনি আর গলফ খেলতে পারবেন না। কিন্তু সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়ে মাত্র নয় মাস পর খেলতে নামেন এবং এরপর ছয়বার মেজরস চ্যাম্পিয়নশিপ জেতেন। বেন হোগেন তার ক্যারিয়ারে মোট ৬৪ বার পিজিএ ট্যুর জয় করছেন এবং নয় বার মেজরস চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছেন।

 

৫.স্যাম সাইনড

ছবিতে স্যাম সাইনড : source: pinterest.com

স্যাম সাইনড ছিলেন একজন আমেরিকান পেশাদার গলফার। যিনি চার দশকের বেশিরভাগ সময় বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় ছিলেন। তিনি ইউএস ওপেন জয় করতে না পারলেও যদিও তিনি চারবার রানার্সআপ হয়েছিলেন।

সাইনড এর ডাকনাম ছিল স্ল্যামিন স্যামি। গলফ বলে নিখুঁত সুইং থাকার জন্য তিনি অনেকের প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন।  ১৯৭৪  সালে তিনি বিশ্ব গলফের হলের অফ ফেমের অন্তর্ভুক্ত হন এবং ১৯৯৮ সালে পি জি এ ট্যুর লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কার লাভ করেন। গলফ ইতিহাসের একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে তিনি তার ক্যারিয়ারে মোট ৮২ টি পিজিএ ট্যুর জিতেছিলেন। এছাড়া সাইনড সাতবার মেজর চ্যাম্পিয়নশিপও জিতেছিলেন।

৪. ওয়াল্টার হ্যাগেন

গলফ মাঠে খেলছেন ওয়াল্টার হ্যাগেন। source:thoughtco.com

সর্বকালের সেরাদের মধ্যে তৃতীয় খেলোয়াড় হিসেবে ওয়াল্টার হ্যাগেন সর্বোচ্চ ১১ বার মেজরস চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছিলেন। পরিসংখ্যানের দিক দিয়ে টাইগার উডস ও জ্যাক নিকালসের পরেই তার অবস্থান। তিনি ১৯৯২ সালে প্রথম আমেরিকান হিসেবে ওপেন চ্যাম্পিয়নশিপ জয় করেন। হ্যাগেন ছয়বার মাস্টার্স টুর্নামেন্ট খেললেও  দুর্ভাগ্যবশত একটিতেও চ্যাম্পিয়নশিপ জয়  করতে পারেননি। তার ক্যারিয়ারে তিনি মোট ৪৫ বার পিজিএ ট্যুর এবং ১১ বার মেজরস চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছিলেন।   

৩. ববি জোনস 

 ববি জোনস:source:thoughtco.com

ববি জোনস ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের একজন অপেশাদার গলফার। তিনি ১৯২০ সালে মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টার জর্জিয়া শহরে জন্মগ্রহণ করেন। জোনস পেশায় ছিলেন একজন আইনজীবী। ১৯২৩ সাল থেকে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন গলফের অন্যতম মহানায়ক। এই সাত বছরে মোট চারবার মেজরস চ্যাম্পিয়নশিপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল , যার চারটিতে তিনি শিরোপা জিতেছিলেন। বনি জোনস বর্তমানে অন্যতম জনপ্রিয় মাস্টার্স চ্যাম্পিয়নশিপের প্রতিষ্ঠাতাও। ১৯৩০ সালে তিনি চারটি মেজরস কাপ জেতার মাধ্যমে ক্যারিয়ারের গ্র্যান্ড স্ল্যামের মালিক হন। এই অপেশাদার গলফার তার ক্যারিয়ারে পিজিএ ট্যুর  সাতবার ও মেজরস  চ্যাম্পিয়নশিপ ১৩ বার  জয় করেন।

২ . টাইগার উডস 

টাইগার উডস ; Source: gettyimages.com 

টাইগার উডস একজন মার্কিন পেশাদারি গলফার এবং সর্বকালের সেরা গলফারদের একজন। বর্তমানের তিনি সবচেয়ে সেরা  গলফার। তিনি ১৯৭৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ক্যালিফোর্নিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান এবং   মার্কিন জাতীয়তা নিয়েই গলফ খেলেছেন। গলফ ইতিহাসে তিনি সর্বোচ্চ দ্বিতীয় মেজর চ্যাম্পিয়নশিপজয়ী খেলোয়াড়। উডস তার  ক্যারিয়ারে সর্বমোট ১৪ বার মেজরস চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছিলেন। যার ভিতরে ছিল চারটি মাস্টার্স চ্যাম্পিয়নশিপ , তিনটি ইউএস ওপেন ,তিনটি ওপেন চ্যাম্পিয়নশিপ এবং চারবার পিজিএ চ্যাম্পিয়নশিপ। তিনি মোট ৭৯ বার  পিজিএ ট্যুর  জিতেছিলেন।

১. জ্যাক নিকোলাস

গলফ ইতিহাসে সর্বকালের সর্বসেরা এবং সর্বকনিষ্ঠ গলফার ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জ্যাক নিকোলাস। নিকোলাস তার ১৯ বছরের ক্যারিয়ারে মোট ১৮ বার মেজরস চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছিলেন এবং ১৯ বার রানার্স আপ হন। যেটা এখনো গলফ ইতিহাসে কোন খেলোয়াড়ের সেরা অর্জন। ১৯৭৪ সালে তিনি ওয়ার্ল্ড গলফ হল অফ ফেমের সদস্য হন। নিকোলাস পিজিএ ট্যুর চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছেন ৭৯  বার। তিনি যে সকল  টুর্নামেন্ট থেকে মেজরস জয় করছেন সেগুলো হলঃ

মাস্টার টুর্নামেন্ট :১৯৬৩, ১৯৬৫, ১৯৬৬ ১৯৭২ ,১৯৭৫, ১৯৮৬ সাল ।

ইউএস ওপেন: ১৯৬২, ১৯৬৭, ১৯৭২,১৯৮০ সাল।

ওপেন চ্যাম্পিয়নশিপ: ১৯৬৭ , ১৯৭০ , ১৯৭৮ সাল ।

পিএজিএ চ্যাম্পিয়নশিপ : ১৯৬৩ , ১৯৭১ , ১৯৭৩ , ১৯৭৫ , ১৯৮০ সাল ।

এখনও পর্যন্ত গলফের ইতিহাসে  নিকোলাসই সর্বকালের সেরা গলফার। তবে  বর্তমানে টাইগার উডস যেভাবে খেলছেন, সে ধারা বজায় রাখলে নিকোলাসকে ছাড়িয়ে তিনিই হয়ে যেতে পারেন সর্বকালের সেরা গলফার।

 

Featured image source : diepresse.com 

One Comment

Leave a Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *