রোমার কাছে হার থেকে শিক্ষা নেয়নি বার্সেলোনা

জার্মান দার্শনিক জর্জ উইলহেম ফ্রেডরিখ হেগেল (পাপা হেগেল) ইতিহাস সম্পর্কে বলেন

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এই যে মানুষ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না। অনেকে আজ সকালের কথাই ভুলে যান।

পাপা হেগেলের কথাটি প্রায় শতভাগই সত্য এবং আমাদের চারপাশের প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তার প্রমাণ স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনার কোচ আর্নেস্তো ভালভার্দে আরো একবার দিয়েছেন। লিভারপুলের বিপক্ষে প্রথম লেগে ৩-০ গোলের জয়ের পর দ্বিতীয় লেগে ৪-০ গোলে হেরে চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নিতে হয়েছে। অ্যানফিল্ডে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় লেগের ম্যাচে লিভারপুলের কাছে বার্সাকে মনে হয়েছে বয়সভিত্তিক কোনো এক দল।

Image Source: foxsports.com.au

লিভারপুলের কাছে বার্সার এই হার চ্যাম্পিয়নস লিগের গত মৌসুমের কোয়ার্টার ফাইনালকে মনে করিয়ে দিচ্ছে। গত মৌসুমে ইতালিয়ান জায়ান্ট এএস রোমার বিপক্ষে প্রথম লেগে ৪-১ গোলের বড় জয় পায় কাতালানরা। তাদের এই জয়ে অনেকেই বার্সাকে সেমিফাইনাল দেখেছিলেন। কিন্তু ফিরতি লেগে রোমার ঘরের মাঠে ৩-০ গোলে পরাজিত হয় স্প্যানিশ জায়ান্টরা। সেমিতে উঠার জন্য তাদের ঠিক ৩-০ গোলের জয়ই প্রয়োজন ছিল। ঠিক একইভাবে আবারো প্রথম লেগে বড় জয় পাওয়ার পরও দ্বিতীয় লেগে হারের কারণে চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকে বার্সাকে বিদায় নিতে হয়েছে।

Image Source: bbc.co.uk

বার্সা কোচ ভালভার্দে অতীত থেকে শিক্ষা নেননি। রোমার ম্যাচকে তিনি স্মরণ রাখলে দলের রক্ষণভাগকে আটসাট করে নামতেন। যদিও তিনি সেরা একাদশ নিয়েই মাঠে নেমেছিলেন, কিন্তু তার পরিকল্পনায় বেশ ঘাটতি ছিল। রোমা ও লিভারপুলের বিপক্ষে বার্সার দুইটি হারই একইসূত্রে গাঁথা। বলা চলে দুটি ম্যাচই যেন একে অপরের অনুলিপি। প্রায় একই সময়ে বার্সা দুই দলের বিপক্ষে গোল হজম করেছে। কিন্তু কোচ ভালভার্দে ছিলেন পুরোপুরি অসহায়। তিনি দলের পরাজয় ঠেকানোর জন্য কোনো কিছুই করতে পারেননি।

রোমার বিপক্ষে যেমন ম্যাচের শুরুতেই গোল হজম করে পিছিয়ে পড়ে ভালভার্দের দল। তেমনি লিভারপুলের ক্ষেত্রেও হয়েছে। রোমার এডিন জেকোর গোলটি ছিল ম্যাচের ছয় মিনিটের মাথায়, অন্যদিকে লিভারপুলের ডিভক অরিগির ছিল সাত মিনিটের মাথায়। রোমা সাধারণত ডিফেন্সিভ ফুটবল খেলে থাকে। কিন্তু ২০১৮ সালে বার্সার বিপক্ষে তারা এতটাই আক্রমণাত্মক ছিল যে, ম্যাচের অধিকাংশ সময় বার্সার মিডফিল্ডাররা নিজেদের অর্ধে থেকেছেন। ঠিক যেমন লিভারপুলের বিপক্ষে হয়েছে। বল দখলে বার্সা এগিয়ে থাকলেও তাদের গোলরক্ষককে একের পর এক আক্রমণ সামলাতে হয়েছে।

Image Source: Getty Images

রোমার মতোই প্রথমার্ধে আর কোনো গোল করতে পারেনি লিভারপুল। কিন্তু ইতালিয়ান জায়ান্টদের মতোই ম্যাচের সময় এক ঘন্টা পার হওয়ার আগেই ব্যবধান ২-০ করে তারা। টুর্নামেন্টে টিকে থাকার জন্য বার্সার বিপক্ষে রোমার চেয়ে এক গোল বেশি প্রয়োজন ছিল লিভারপুলের। এক ঘন্টার আগেই তারা প্রথম লেগের ৩ গোল পরিশোধ করে। এরপর বার্সা ও লিভারপুলের জন্য প্রয়োজন ছিল শুধুমাত্র একটি গোল। বার্সা এক গোল করতে পারলে ফাইনালে যাওয়ার টিকিট পেতো। কিন্তু রোমার মতো এই ম্যাচেও মেসি-সুয়ারেজরা একটিমাত্র গোল করতে ব্যর্থ হয়।

বার্সার এই বিপর্যয়ের কারণ কী?

লিভারপুলের কাছে বার্সার বিধ্বস্তে পেছনে একক কোনো কারণ নেই। বরং বেশ কিছু ভুলের সম্মেলনেই তাদের হার। বিশেষ করে কোচ ভালভার্দের গেম প্লান ছিল একেবারেই ভুল। তিনি যখন সেটা বুঝতে পারলেন, তখনো তিনি কোনো পদক্ষেপ নেননি। একটু দেরিতে যখন পরিকল্পনায় নতুন কিছু যোগ করতে চাইলেন, তখনো তিনি ভুল করে বসেন।

ভালভার্দে ভেবেছিলেন তিনি শক্তিশালী বেঞ্চ পাবেন। কিন্তু উসমান ডেম্বেলে চোট থেকে সুস্থ না হওয়ার কারণে তাকে তিনি মাঠে নামাতে পারেননি। এছাড়া তার ধারণা ছিল প্রথম লেগের মতো দ্বিতীয় লেগেও সবকিছু সামাল দেবেন মেসি-সুয়ারেজ। কিন্তু তাদের পক্ষে সেটা সম্ভব হয়নি। তাদের দুজনকেই বারবার হতাশ করেছেন অ্যালিসন।

Image Source: telegraph.co.uk

বার্সা তিন গোলে এগিয়ে থাকায় তাদের রক্ষণাত্মক ফুটবলের চেয়ে আক্রমণাত্মক খেলার দিকে মনোনিবেশ করা উচিৎ ছিল। কারণ অ্যানফিল্ডে একটি মাত্র গোলই তাদের ফাইনাল নিশ্চিতের কারণ হতে পারতো। কিন্তু ভালভার্দে ডিফেন্সিভ ফুটবলকে বেছে নেন। তার এই সিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণ করতে লিভারপুলের খুব বেশি সময় লাগেনি। ম্যাচের শুরুতেই বার্সার রক্ষণভাগকে পরাস্ত করে স্বাগতিকরা।

ডিফেন্সের দুর্বলতা বার্সার এই হারের বড় কারণ। কেননা দ্বিতীয়ার্ধে অল্প সময়ে দুই গোল হজম করার পর থেকে বার্সার খেলোয়াড়রা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। যার ফলে স্বাগতিকরা চতুর্থ গোল তুলে নিয়ে ফাইনাল নিশ্চিত করে। ডিফেন্সের পাশাপাশি বার্সার মাঝমাঠের পারফরম্যান্সও খুব বেশি ভালো ছিল না। কুতিনহো সাবেক ক্লাব মাঠ হওয়ায় অ্যানফিল্ড ছিল তার সবচেয়ে চেনা। কিন্তু তিনি তার বাড়তি এই সুবিধাকে কাজে লাগাতে পারেননি। পুরো ম্যাচে তিনি ছিলেন একেবারেই নিষ্প্রভ।

Image Source: talksport.com

বার্সার আরেক তারকা আর্তুরো ভিদাল ছিলেন নিজের ছায়া হয়ে। তবে ইভান রাকিটিচ ভালো করলেও, তিনি ম্যাচের অধিকাংশ সময়ই সার্জিও বুসকেটসকে বল সরবরাহ করে গেছেন। তবে জর্ডি আলবা তার চেনা ছন্দেই খেলেছেন। মেসি ও সুয়ারেজ গোল করার জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালিয়েছেন। কিন্তু তাদের সামনে পাহাড়সম বাধা হয়ে দাঁড়ান অ্যালিসন বেকার। লিভারপুলের জয়ের পেছনে ব্রাজিলিয়ান এই গোলরক্ষকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অ্যালিসন বেশ কয়েকটি দুর্দান্ত সেভ করেন। তার সেভগুলোই ম্যাচের পার্থক্য গড় দিয়েছে।

লিভারপুলের বিপক্ষে খেলা সবসময় কঠিন। তারা ভয়ানক, সুসংগঠিত এবং প্রচুর প্রাণশক্তিপূর্ণ দল। ঘরের মাঠে তাদের বিপক্ষে জয় পাওয়া অনেক কঠিন। সে জন্য লিভারপুলের বিপক্ষে মাঠে নামার আগে প্রয়োজন ভালো কিছু পরিকল্পনা। ভালভার্দের সেই পরিকল্পনাতেই ভুল ছিল। তিনি আগের মৌসুমের রোমার ম্যাচ থেকে শিক্ষা নেননি।

Featured Image Source: Getty Images

The post রোমার কাছে হার থেকে শিক্ষা নেয়নি বার্সেলোনা appeared first on Khela.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *