দ্য মিরাকল অব বার্ন: জার্মানির উত্থান

১৯৫৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনাল। সুইজারল্যান্ডের বার্ন শহরে ওয়াংকডর্ফ স্টেডিয়ামে ৬২ হাজার দর্শক অপেক্ষায় আছে ফেরেঙ্ক পুসকাসের ‘ম্যাজিকাল ম্যাগিয়ার্স’ এর হাতে কখন বিশ্বকাপের ট্রফি উঠবে। এর আগের ৪ বছর ধরে না হারা দলটি ইতোমধ্যে ১০ মিনিটের মাথায় ২-০ তে এগিয়ে গিয়েছে পশ্চিম জার্মার্নির বিপক্ষে যাদেরকে টুর্নামেন্টের শুরুতে ৮-৩ গোলে পরাজিত করেছিল তারা। কিন্তু ফুটবল বিধাতা হয়তো ভিন্নকিছু ভেবে রেখেছিলেন সেবার। যেখানে হাঙ্গেরি গত ৪ বছরে হারের মুখ দেখেনি, সেখানে চার বছর আগে পশ্চিম জার্মানির কোন ফুটবল দলই ছিল না এবং সেই দলটি ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনালে অন্যতম সেরা প্রত্যাবর্তনের রূপকথা রচনা করে ২-৩ স্কোরলাইনে ফাইনাল শেষ করে।

পশ্চিম জার্মানির সুইজারল্যান্ড
যাত্রাপথ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্বের পূর্বে জার্মানির ফুটবল দল ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছিল। ১৯৩৬ সালের বিশ্বকাপে অস্ট্রিয়াকে হারিয়ে ৩য় স্থান লাভ করে দলটি। ১৯৩৭ সালে জার্মানি জাতীয় দলের কোচ হয়ে আসেন সেপ হারবার্গার যিনি রাজনৈতিক ভাবে নাৎসি পার্টির সাথে জড়িত ছিলেন। যুদ্ব শুরু হলে শুরুর দিকে জার্মান জাতীয় দল এর আঁচ বুঝতে না পারলেও একসময় জাতীয় দলের খেলোয়াড়দেরও ফ্রন্টে পাঠানোর নোটিশ আসতে শুরু করে। সেপ হারবার্গার তার সাধ্যমত চেষ্ঠা করে যায় তার খেলোয়াড়দের বাঁচাতে, কিন্তু সবাইকে রক্ষা করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। শাল্কের ২১ বছর বয়সী স্ট্রাইকার এডলফ ইউরবানকে প্রাণ হারাতে হয় স্টালিনগ্রাদে যিনি ১৯৪২ সালে শাল্কের লিগ জয়ের অন্যতম কারিগর ছিলেন। ১৯৪৩ সালে জার্মানিতে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলায় স্থগিতাদেশ জারি করা হয়, ১৯৪৪ সালে আগস্টে ক্লাব ফুটবলও বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয়া হয়। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বড় ক্লাবগুলোর মধ্যে অনেক ক্লাব বন্ধ করে দেয়া হয়। ১৯৪৯ সালে জার্মান এফএ, দ্য ডিএফবি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৫০ সালে হারবার্গারের অধীনে পশ্চিম জার্মানি জাতীয় দল গঠন করা হয়। সেপ্টেম্বরে ফিফার স্বীকৃতি পাবার পর নভেম্বরে পশ্চিম জার্মানি যুদ্ধ পরবর্তী প্রথম কোন আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি হারবার্গের দল জিতে  ১-০ তে।

বার্নে ফাইনালে পশ্চিম জার্মানি দল; image source: guardian.com

হারবার্গের দল ১৯৫৪ বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব শুরু করে নরওয়ের সাথে ১-১ গোলে ড্র দিয়ে। তবে শেষ পর্যন্ত নতুন স্বাধীন হওয়া সারল্যান্ডের বিপক্ষে ৩-১ এ জয়ের মাধ্যমে ফিফার ফুটবল বিশ্বকাপের ৫ম আসরে জায়গা করে নেয় পশ্চিম জার্মানি।

হাঙ্গেরির সুইজারল্যান্ড যাত্রাপথ

জার্মানির মতোই যুদ্ধ পূর্ব সময়ে হাঙ্গেরি ফুটবল বিশ্ব অন্যতম শক্তিশালি দল হিসবে বিবেচিত ছিল। ১৯৩৮ সালের বিশ্বকাপে রানার্স আপ এবং ১৯১২ সালে অলিম্পিকে স্বর্ণপদক জেতে দলটি। তবে ফুটবলে হাঙ্গেরির সোনালি প্রজন্মের জন্ম বিশ্বযুদ্ধের পরে। যুদ্ধের পর ফেরেঙ্ক পুসকাস, গোলকিপার গ্রোসিস্ক, ডিফেন্ডার বজজিস্ক ,কসসিস্ক, জোলতানের মতন তুখোড় খেলোয়াড়েরা একই সাথে জাতীয় দলে যোগ দেয়। সেসময় দলের দায়িত্ব নেন গুস্তাভ সেবেচ।

দারুণ সব খেলোয়াড় থাকলেও
হাঙ্গেরি পূর্ণরুপে দল হিসেবে খেলতে শুরু করে ’৪৯ এ চেকস্লোভাকিয়ার কাছে হারের পর।
হার থেকে শিক্ষা নিয়ে হাঙ্গেরি দল ব্যাক্তিগত নৈপুন্যতার সাথে সাথে ফরমেশন এবং
ট্যাকটিক্সে মনোযোগ দেয়। খেলোয়াড়দের প্রতি নির্দেশ ছিল তারা যেন প্রতিনিয়ত তাদের অবস্থান
পরিবর্তন করতে থাকে, যাতে করে বিপক্ষ দলের খেলোয়াড়েরা তাদের পরিকল্পনা সম্বন্ধে জানতে
না পারে।

হাঙ্গেরির সোনানি প্রজন্ম ‘দ্য ম্যাজিক্যাল ম্যাগিয়ার্স’; image source: scroll.in

আরো একটি বিষয় ছিল যে হাঙ্গেরি দলটি তাদের নাম্বার নাইন পজিশনে কোনো খেলোয়াড় না খেলিয়ে তাকে আরেকটু নিচে ‘ট্রেকোয়ার্স্ট্রিস্টা’ পজিশনে খেলাতো। শুরুরদিকে এই পজিশনে পিটার পালোটাস খেলতেন এবং ’৫২ এর পর থেকে হিডেকুটি ৯ নাম্বার জার্সি পড়তেন কিন্তু খেলতেন ট্রেকোয়ার্স্ট্রিস্টা হিসেবে। ফলাফল হিসেবে ১৯৫০ সাল থেকে ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপের আগ পর্যন্ত হাঙ্গেরি ৩০ এর উপরে ম্যাচ খেলে যার একটিতেও তারা হারের মুখ দেখেনি।

বিশ্বকাপের আগে হাঙ্গেরির প্রস্তুতি ম্যাচে বুদাপেস্টে ওয়াল্টার উইন্টারবটম কে ৭-১ এ বিধ্বস্ত করে সুইজারল্যান্ডে টুর্নামেন্টে যাত্রা শুরু করে।

১৯৫৪ সুইজারল্যান্ড
বিশ্বকাপ

’৫৪ এর বিশ্বকাপে ১৬ টি দেশ অংশগ্রহণ করে। এদের মধ্যে ৪ টি গ্রুপ করা হয়। প্রতি গ্রুপে ৪টি দলের মধ্যে ২টি ‘সিডেট’ দল এবং ২টি আনসিডেট দল রাখা হয়। প্রতিটি গ্রুপে ম্যাচ সংখ্যা ছিল চারটি যেখানে সিডেট দল দু’টো নিজেদের মধ্যে খেলবে না। গ্রপে ২য় এবং ৩য় পজিশনের দলের পয়েন্ট সংখ্যা একই হলে তাদের মধ্যে প্লে-অফ ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। এভাবে প্রতিটি গ্রুপ থেকে ২টি করে দল নকআউট রাউন্ডে প্রবেশ করবে।

গ্রুপ ২ এ সিডেট হিসেবে ছিল হাঙ্গেরি এবং তুরস্ক। আর আনসিডেট টিম ছিল পশ্চিম জার্মানি এবং দক্ষিণ কোরিয়া। দক্ষিণ কোরিয়া হাঙ্গেরি এবং তুরস্কের সাথে যথাক্রমে ৯-০ এবং ৭-০ গোলে পরাজিত হয়। অন্যদিকে পশ্চিম জার্মানি প্রথম ম্যাচে তুরস্কের সাথে ৪-১ এ জিতলেও পরবর্তী ম্যাচে হাঙ্গেরির বিপক্ষে দ্বিতীয় সারির দল খেলিয়ে ৮-৩ গোলে পরাজিত হয়। পরবর্তীতে তুর্কিদের সাথে প্লে-অফ খেলে গ্রুপে ২য় হয়ে নক আউট রাউন্ড নিশ্চিত করে।

পশ্চিম জার্মানির
সাথে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে হাঙ্গেরি দলের অধিনায়ক ফেরেঙ্ক পুসকাসকে মারাত্মক ফাউল করে
বসেন জার্মান ডিফেন্ডার ওয়ার্নার লাইব্রিখ। পুসকাস ইঞ্জুরি নিয়ে মাঠ ছাড়েন এবং ইঞ্জুরির
দরুণ পরের দু’টি ম্যাচ খেলতে পারেননি।

কোয়ার্টার ফাইনালে হাঙ্গেরির প্রতিপক্ষ ছিল ব্রাজিল। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বর্বর ম্যাচ হিসেবে বিবেচনা করা হয় হয় এটিকে। ম্যাচে শেষ হয় ৪-২ স্কোরলাইনে হাঙ্গেরির পক্ষে। সেমিফাইনালে প্রতিপক্ষ হিসেবে আসে উরুগুয়ে। নির্ধারিত সময়ে ২-২ সমতা ম্যাচ শেষ হলে অতিরিক্ত সময়ে আরো দু’টো গোল দিয়ে ফাইনালে পৌছে যায় হাঙ্গেরি

সেমিফাইনালে উরুগুইয়ের বিপক্ষে হিডেকুটির গোল; image source: guardian.com

অন্যদিকে কোয়ার্টার ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির প্রতিপক্ষ ছিল যুগোস্লাভিয়া যাদের ২-০ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালে মুখোমুখি হয় অস্ট্রিয়ার। অস্ট্রিয়াকে ৬-১ গোলের ব্যবধানে হারিয়ে ফাইনালে পৌছে পাশ্চিম জার্মানি।

মিরাকল অব বার্ন

সুইজারল্যান্ডের বার্ন শহরে ওয়াংকডর্ফ স্টেডিয়ামে প্রায় ৬২ হাজার দর্শক জমায়েত হয় ফাইনাল দেখতে। ফাইনালের দিন বৃষ্টি হচ্ছিল এবং এরকম আবহাওয়াকে জার্মান ফ্যানরা বলত ‘ফ্রিজ ওয়াল্টার ওয়েদার’ কারণ জার্মান অধিনায়ক ফ্রিজ ওয়াল্টার নাকি বৃষ্টির দিনে খুব ভালো খেলতেন। সেজন্য জার্মান দলের জন্যে বৃষ্টির দিনে খেলার উপযোগী জুতার ব্যবস্থা করে দিন এডি ডাসলার ( এডিডাসের প্রতিষ্ঠাতা)।

অন্যদিকে পুরোপুরি ইঞ্জুরি থেকে না সেরে উঠা সত্ত্বেও খেলতে নেমে যান হাঙ্গেরি দলের অধিনায়ক ফেরেঙ্ক পুসকাস। গ্রুপ পর্বে ৮-৩ এ হারানো দলের বিপক্ষে পুনরায় খেলতে নেমে ৬ মিনিটের মাথায় গোল করে দলকে এগিয়ে দেন পুসকাস। তার আরো ২ মিনিট পরে জাইবোরের গোলে স্কোরলাইন দাঁড়ায় ২-০ তে। সবাই যখন ধরে নিয়েছিল এবারের বিশ্বকাপ হাঙ্গেরির ঘরে উঠতে যাচ্ছে, তখন ১০ মিনিটের মাথায়। মোরলোকের গোলে ১ গোল ফিরিয়ে দেয় পশ্চিম জার্মানি। আর ১৯তম মিনিটে হেলমুট রান সমতাসূচক গোল করে জার্মানিকে ম্যাচে ফিরিয়ে আনেন। ২-২ স্কোরলাইনে প্রথম অর্ধ শেষ হয়।

দ্বিতীয় অর্ধে চলে হাঙ্গেরি দলের একের পর এক মিসের মহড়া। যার খেসারত হিসেবে হঠাৎ আকস্মিকভাবে ৮৪ মিনিটের মাথায় হেলমুট রান গোল করে জার্মানিকে প্রথমবারের মত ম্যাচে লিড এনে দেয়। ম্যাচের ২ মিনিট বাকি থাকতে ফেরেঙ্ক পুসকাস আরেকটি গোল করেন কিন্তু অফসাইডের কারণে তা বাতিল হয়ে যায়। ম্যাচ শেষ হয় ৩-২ স্কোরলাইনে এবং পশ্চিম জার্মানি প্রথমবারের মতন ঘরে তুলে নেয় ফুটবল বিশ্বকাপের ‘জুলে রিমে ট্রফি’।

জুলে রিমে ট্রফি হাতে জার্মান খেলোয়াড়েরা; image source: guardian.com

ম্যাচ শেষে কিছু বিতর্ক উঠে আসে। ধারণা করা হয় যে জার্মান খেলোয়াড়রা দ্বিতীয় অর্ধে শক্তিবর্ধক মাদক নিয়ে খেলতে  নেমেছিলেন। পুসকাসের শেষের অফসাইড গোল নিয়েও আছে অনেক বিতর্ক। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে এটি মোটেও অফসাইড ছিল না। এছাড়াও ফুটেজ থেকে দেখা যায় জার্মানির ২-২ সমতা গোলের আগমূহুর্তে হাঙ্গেরির গোলকিপারকে বাধা দেয়া হয় কর্নার ক্লিয়ারে।

পুসকাসের অফসাইডের কারণে বাতিল হওয়া গোল; image source: guardian.com

তবে বিতর্ক বাদ দিলে জার্মানির এ সাফল্য ছিল অবিস্মরণীয়। চার বছর আগে যে জার্মান দলের কোন অস্তিত্বই ছিল না, তারাই টুনার্মেন্টের সবচেয়ে শক্তিশালি দল হাঙ্গেরির সোনালি প্রজন্মের অপরাজেয় ‘ম্যাজিক্যাল ম্যাগিয়ার্স’ কে হারিয়ে ইতিহাস রচনা করে। যুদ্ধ বিধ্বস্ত জাতির কাছে এর চেয়ে ভালো উপহার আর কিছুই হতে পারতো না সেসময়। জাতিগতভাবে জার্মানদের জন্য এ জয় বিশ্বকাপের চেয়ে বেশি কিছু ছিল। যুদ্ধে হারানো আত্মগৌরব ফিরে পাওয়ার যাত্রা শুরু এবং জাতি হিসেবে আবারো মাথা তুলে দাড়ানোর প্রেরণা হিসবে আজো তুলে ধরা হয় এ সাফল্য।

Featured image source: Scroll.com

The post দ্য মিরাকল অব বার্ন: জার্মানির উত্থান appeared first on Khela.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *