চ্যাম্পিয়নস লিগে অবিশ্বাস্য ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

চ্যাম্পিয়নস লিগের চলতি মৌসুমের সেমিফাইনালের মতো নাটকীয় ফলাফল এর আগে কখনো দেখা যায়নি বললেই চলে। দুইটি সেমিফাইনালেই প্রথম লেগে পিছিয়ে থাকা দলগুলো দ্বিতীয় লেগে দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে। লিভারপুল বনাম বার্সেলোনা এবং আয়াক্স বনাম টটেনহামের দুটি ম্যাচ বেশ চমকপ্রদ ছিল। বার্সার প্রথম লেগে ৩-০ গোলে জয়ের পরে অনেকেই লিভারপুলের সমর্থকদের সান্ত্বনা দেওয়া শুরু করেন। কিন্তু কেউ ভাবতে পারেননি লিভারপুল এভাবে ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম। নিজেদের ঘরের মাঠ অ্যানফিল্ডে ৪-০ গোলে বার্সাকে বিধ্বস্ত করে ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে ক্লপের শিষ্য।

বার্সাকে হারানোর পর লিভারপুলের খেলোয়াড়দের উল্লাস; Image Source: Getty Images

অপর সেমিফাইনালের প্রথম লেগে ঘরের মাঠে আয়াক্সের কাছে ১-০ গোলে পরাজিত হয় টটেনহাম। নিজেদের মাঠে হারায় আয়াক্সের মাঠে পচেত্তিনোর শিষ্যরা জয় পাবেনা বলেই ধরে নিয়েছেলেন ফুটবল ভক্তরা। কিন্তু লিভারপুলের মতো তারাও দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়ায়। লুকাস মোরার অসাধারণ এক হ্যাটট্রিকে ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে টটেনহাম। চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসে এই দুটি ম্যাচকে অন্যতম সেরা ম্যাচ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে লিভারপুলের জয়কে বলা হচ্ছে ইউরোপিয়ান ফুটবলের সেরা কামব্যাক। তবে এমন আরো অসংখ্য কামব্যাক করা ম্যাচ রয়েছে। তার মধ্যে থেকে বাছাইকৃত চারটি ম্যাচ থেকে সাজানো হয়েছে আমাদের আজকের আয়োজন।

মোনাকো বনাম রিয়াল মাদ্রিদ, ২০০৩-০৪ মৌসুম

মাত্র এক মৌসুম আগেই চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপা ঘরে তোলা রিয়াল মাদ্রিদ আগের মৌসুমেও খেলেছে সেমিফাইনাল। ২০০৩-০৪ মৌসুমে কোয়ার্টার ফাইনালে ফরাসি লিগ ওয়ানের ক্লাব মোনাকোর মুখোমুখি হয় রিয়াল। প্রথম লেগে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে জিনেদিন জিদান, লুইস ফিগো এবং রোনাল্ডোর গোলে ৪-২ ব্যবধানে জয় পায়। দুই গোলে এগিয়ে থেকে দ্বিতীয় খেলার জন্য মোনাকোর মাঠে যায় রিয়াল। ম্যাচের শুরুতেই রাউল গঞ্জালেসের গোলে অ্যাগ্রিগেট দাঁড়ায় ৫-২ গোলে।

রিয়ালকে হারানোর পর মোনাকোর খেলোয়াড়রা; Image Source: goal.com

কিন্তু মোনাকো হাল ছাড়ার পাত্র নয়। বিরতির আগে লুডোভিক জুলির নেওয়া নিচু এক ভলি থেকে গোল পায় স্বাগতিকরা। এরপর রিয়াল থেকে ধারা আসা ফার্নান্দো মরিয়েন্তেসের হেড থেকে ব্যবধান ২-১ করে মোনাকো। জুলির দ্বিতীয় গোলে ভর করে ৩-১ গোলের জয় পায় স্বাগতিকরা। ফলে অ্যাগ্রিগেট দাঁড়ায় ৫-৫ গোলে। কিন্তু অ্যাওয়ে গোলে এগিয়ে থেকে সেমিফাইনালে জায়গা করে নেয় মোনাকো।

এএস রোমা বনাম বার্সেলোনা, ২০১৭-১৮ মৌসুম

১০১৭-১৮ মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে ইতালিয়ান জায়ান্ট রোমার মুখোমুখি হয় বার্সেলোনা। এই ম্যাচটিকে চলতি মৌসুমের লিভারপুল বনাম বার্সেলোনার ম্যাচ এর সাথে তুলনা করা যেতে পারে। রোমার বিপক্ষে দ্বিতীয় লেগে মাঠে নামার আগ পর্যন্ত বার্সেলোনা বেশ স্বস্তিদায়ক অবস্থায় ছিল। সে সময় কাতালান জায়ান্টরা ঘরোয়া লীগ ও আন্তর্জাতিক ফুটবলে পুরোপুরি অপরাজিত ছিল। তারই ধারাবাহিকতায় প্রথম লেগে রোমাকে ৪-১ গোলে বিধ্বস্ত করে মেসির বার্সেলোনা।

বার্সা বধের পর রোমার উৎসব; Image Source: Reuters

কিন্তু দ্বিতীয় লেগে তারা মুদ্রার উল্টো পিঠ দেখেন। রোমান মাঠে ৬ মিনিটের মাথায় গোল হজম করে বসে সফরকারীরা। স্বাগতিকদের হয়ে গোল করেন এডিন জেকো। বিরতির পর ব্যবধান দ্বিগুণ করেন ডি রোজি। বার্সার কফিনে শেষ পেরেকটি মারেন রোমা ডিফেন্ডার কস্তাস মানোলাস। ৩-০ গোলে হার নিয়ে মাঠ ছাড়ে কাতালানরা। ফলে অ্যাওয়ে গোলে এগিয়ে থেকে সেমিতে জায়গা করে নেয় রোমা।

এসি মিলান বনাম দেপোর্তিভো লা করুনা, ২০০৩-০৪ মৌসুম

২০০৪ সালে ইতালিয়ান জায়ান্ট এসি মিলানের স্কোয়াড তারকায় ভরপুর ছিল। মিলানের হয়ে তখন কাকা, কাফু, আন্দ্রেয়া পিরলো, পাওলো মালদিনি এবং আন্দ্রেই শেভচেঙ্কো খেলতেন। চ্যাম্পিয়নস লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে এসি মিলানের সেই শক্তিশালী দলের মুখোমুখি হয় স্প্যানিশ ক্লাব দেপোর্তিভো লা করুনা।

Image Source: goal.com

প্রথম লেগের সাক্ষাতে দেপোর্তিভোকে ৪-১ গোলে বিধ্বস্ত করে মিলান। কিন্তু এই ফলাফলে মোটেও হতাশ ছিলেন না দেপোর্তিভো কোচ হ্যাভিয়ের ইরুরেটা। তিনি ম্যাচ শেষে বলেন,

অলৌকিক ঘটনাগুলো প্রায়ই ঘটে।

দ্বিতীয় লেগের ভেন্যু ছিল দেপোর্তিভোর মাঠ। সেমিফাইনালে উঠার জন্য তাদের প্রয়োজন ছিল কমপক্ষে ৩-০ গোলের জয়। ম্যাচের শুরুতেই ওয়াল্টার পানদিয়ানির গোলে এগিয়ে যায় স্বাগতিকরা। বিরতির আগেই ব্যবধান ৩-০ করেন হুয়ান কার্লোস ভ্যালেরন এবং আলবার্ট লুকে। সেমিফাইনালে যাওয়ার জন্য এই ব্যবধানই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু ইরুরেটার শিষ্যরা তখনো তৃপ্ত ছিলেন না। তারা মিলানের জালে আরো একবার বল পাঠিয়ে পরবর্তী রাউন্ড নিশ্চিত করে।

বার্সেলোনা বনাম পিএসজি, ২০১৬-১৭ মৌসুম

এই ম্যাচের স্মৃতি প্রত্যেক ফুটবল ভক্তের মাথায় এখনো তরতাজা। চ্যাম্পিয়নস লিগে পিএসজি বনাম বার্সেলোনার এই ম্যাচের আগে কোনো দলই ৪-০ গোলে এগিয়ে থেকে বিদায় নেয়নি। কিন্তু ২০১৬-১৭ মৌসুমে সেই অসাধ্যকে সাধন করেন মেসি-নেইমাররা। সেই মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগের দ্বিতীয় রাউন্ডের প্রথম লেগে ডি মারিয়া ও জুলিয়ান ড্রাক্সলারের গোলে ৪-০ গোলে জয় পায় পিএসজি। তাদের এই জয়ে অনেকেই বার্সার বিদায় দেখেছিলেন।

গোলের পর সার্জি রবার্তো; Image Source: Getty Images

কিন্তু ন্যু ক্যাম্পে এক নতুন ইতিহাস রচনা করে স্প্যানিশ জায়ান্টরা। পিএসজির মাঠে কোনো গোল না করতে পারায় বার্সার প্রয়োজন ছিল ৫-০ গোলের বিশাল এক জয়। ম্যাচের তিন মিনিটের মাথায় দুর্দান্ত এক হেডে দলকে এগিয়ে দেন লুইস সুয়ারেজ। ৫০ মিনিটের মধ্যেই ব্যবধান ৩-০ করে বার্সা। ৬২ মিনিটে কাভানি এক গোল পরিশোধ করলে আবারো ব্যাকফুটে চলে যায় বার্সা। ম্যাচের শেষ মুহুর্তে নেইমারের জোড়া গোলে ৫-৫ অ্যাগ্রিগেট হয়। জয়ের জন্য তখনো এক গোল প্রয়োজন স্বাগতিকদের। অতিরিক্ত সময়ের একেবারে শেষ মুহূর্তে সার্জি রবার্তোর গোলে অনবদ্য এক জয় পায় বার্সা।

Featured Image: goal.com

The post চ্যাম্পিয়নস লিগে অবিশ্বাস্য ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প appeared first on Khela.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *