ইয়ুর্গেন ক্লপের হেভি মেটাল ফুটবল

চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালের প্রথম লেগের আগে লিভারপুলের জার্মান কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ বলেছিলেন,

ন্যু ক্যাম্প ফুটবলের মন্দির নয়।

কিন্তু তার দল বার্সেলোনার কাছে ৩-০ গোলে বিধ্বস্ত হয়ে ইংল্যান্ডে ফেরে। বার্সার প্রথম লেগের নায়ক লিওনেল মেসি এই জয়ের পরও নির্ভার থাকতে পারেননি। তিনি উৎসবের জন্য অ্যানফিল্ডের ম্যাচ পরবর্তী ফলাফলের উপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। কারণ মেসি জানতেন অলরেডদের ঘরের মাঠ তাদের জন্য কতটা কঠিন এক ভেন্যু হতে পারে। আর্জেন্টাইন তারকার ভাবনা পুরোপুরি মিলে যায়, যখন তারা ৪-০ গোলে হেরে সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নেয়। বার্সার এই হার ছিল একেবারে অবিশ্বাস্য। তবে অ্যানফিল্ডে লিভারপুলের পারফরম্যান্সই তাদেরকে ফাইনালের টিকিট এনে দেয়।

শিষ্যদের সাথে ইয়ুর্গেন ক্লপ; Image Source: goal.com

বার্সা কোচ আর্নেস্তো ভালভার্দে এবং লিভারপুল কোচ ক্লপের ফুটবল দর্শন ও কৌশলের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। কাতালান জায়ান্টরা আগের মতো এখনো টিকিটাকা ফুটবলকে ধারণ করে আছে। বিপরীতে ক্লপ অ্যানফিল্ডে পা রাখার পরপরই পুরো লিভারপুল দল তার খোলস পাল্টেছে। জার্মান এই কোচ ক্ষিপ্র গতির ফুটবল নীতিতে বিশ্বাসী।ইয়ুর্গেন ক্লপের এই ফুটবল দর্শনকে বলা হয় ‘হেভি মেটাল ফুটবল’। হেভিমেটাল কথাটি সঙ্গীতের সাথে জড়িত। তবে ক্লপের হেভি মেটাল ফুটবলের সাথে এসি/ডিসি কিংবা মেটালিকা ব্যান্ডের কোনো সম্পর্ক নেই। এবং তিনি সালাহ-মানেদের ট্রেনিং সেশনে হেভি মেটাল কোনো গানও শোনাননা।

ইয়ুর্গেন ক্লপ; Image Source: goal.com

তিনি তার শিষ্যদের গতি, আক্রমণ ও কাউন্টার অ্যাটাক নির্ভর ফুটবল খেলার পাশাপাশি দক্ষতার সাথে প্রতিটি সুযোগকে কাজে লাগানোর দীক্ষা দিয়ে আসছেন। ক্লপের ফুটবল দর্শনে খুব বেশি জটিলতা নেই। লিভারপুল বস সবসময় চান দলের খেলোয়াড়রা ম্যাচ চলাকালীন একতা, একাগ্রতা, গতি এবং বিচক্ষণতার সাথে খেলবে। এর বেশি কিছু ক্লপ চান না। কারণ তিনি জানেন এই চারের সম্মেলন ঘটাতে সক্ষম হলে সাফল্য অবশ্যই আসবে।

হেভি মেটাল ফুটবল আসলে কী?

ইয়ুর্গেন ক্লপ এক সাক্ষাতকারে আর্সেনালের সাবেক কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গারের ফুটবল কৌশল সম্পর্কে বলেন,

তিনি নিজেদের পায়ে বল রেখে পাসিং ফুটবল খেলতে ভালোবাসেন। অনেকটা অর্কেস্ট্রার মতো। কিন্তু এটা হচ্ছে ঠাণ্ডা গান। আমি পছন্দ করি হেভি মেটাল গান। আমি সবসময়ই এটা উচ্চ শব্দে শুনতে পছন্দ করি।

ক্লপ যেমন হেভি মেটাল শুনতে পছন্দ করেন, তেমনি নিজের কোচিং দর্শনেও এর প্রয়োগ করছেন। হেভি মেটাল বেশ দ্রুত গাইতে হয় এবং বাজনা বাজানোর জন্য প্রচুর শক্তি ব্যয় করতে হয়। হেভিমেটাল ফুটবলও ঠিক তেমন। এটি গতি, শক্তি ও ক্ষিপ্রতার এক দুর্দান্ত মেলবন্ধন। হেভি মেটাল ফুটবলের মূল কৌশল হলো প্রতিপক্ষের উপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করে যাওয়া। আর এক্ষেত্রে বল হারানোর সম্ভাবনা যত বেশি থাকে, তেমনি বল দ্রুত ছিনিয়ে নেওয়ার সুযোগও থাকে। এর জন্য ডিফেন্ডারদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হয়। তাদের যেকোনো মূল্যে দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রতিপক্ষের ফরোয়ার্ডদের কাছে থেকে বল কেড়ে নিয়ে নিজ দলের স্ট্রাইকারদের কাছে পাঠাতে হয়। সেখান থেকে স্টাইকাররা প্রতিপক্ষের ফাঁক-ফোকর গলিয়ে দক্ষতার সাথে যেন গোল করতে পারেন সেই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

ক্লপের গোল উদযাপন; Image Source: Telegraph

হেভিমেটাল ফুটবলে প্রতিপক্ষের উপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করার কারণে তারা প্রায়ই ভুল করে বসে। তাদের সেই ভুল থেকে বল কেড়ে নিয়ে চোখের পলকে আক্রমণে উঠে যেতে হয় এবং প্রতিপক্ষকে বিস্মিত করে এক মুহূর্তে গোল করতে হয়। এমন ঘটনা লিভারপুল-বার্সা ম্যাচেই দেখা গিয়েছে। ক্লপ তার কয়েক মৌসুমের চেষ্টায় এই ফুটবল কৌশলকে সফল করতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি অ্যানফিল্ডে আসার পর তার নতুন শিষ্যরা হেভি মেটাল ফুটবলের সাথে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছেন। ২০১৮-১৯ মৌসুমে লিভারপুল তাদের ক্লাব ইতিহাসে সর্বোচ্চ পয়েন্ট অর্জন করেছে। সেটা এই হেভি মেটাল ফুটবলের বদৌলতে।

হেভি মেটাল ফুটবলে বল পজিশন কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। এখানে প্রতিপক্ষের উপর চাপ সৃষ্টি করে বল কেড়ে নেওয়া এবং দ্রুত গতিতে কাউন্টার অ্যাটাকে যাওয়াই মূল বিষয়। এর ফলে প্রতিপক্ষ শারীরক ও মানসিকভাবে বেশ দুর্বল হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে সেখান থেকে সুবিধা আদায় করা সম্ভব হয়। এই বিষয়ে ক্লপ বলেন,

আমি ৮০ শতাংশ বল নিজের দখলে রাখতে পছন্দ করি না। আমি ক্লাসিক ফুটবলের চেয়ে ‘ফাইটিং ফুটবল’ অধিক পছন্দ করি।

ক্লপ বর্তমান লিভারপুলকে এমনভাবে গড়ে তুলেছেন যে প্রত্যেক খেলোয়াড় দলের অন্যান্য সতীর্থদের প্রতিটি পদক্ষেপ বুঝতে পারেন। হেভি মেটাল ফুটবলে এই গুণটি আবশ্যক। কেননা এই কৌশলকে মাঠে সফলভাবে প্রয়োগ করতে হলে প্রত্যেক খেলোয়াড়ের মাঝে গভীর সংযোগ থাকতে হবে। কোনো একজন মানিয়ে নিতে ব্যর্থ হলে ম্যাচের ফলাফল তাদের বিপক্ষে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

হেভি মেটাল ফুটবলের অসুবিধা

ইয়ুর্গেন ক্লপের হেভি মেটাল ফুটবলে একজন খেলোয়াড়কে ম্যাচের প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত মনোযোগী থাকতে হয়। সেই সাথে তার মধ্যে সচেতনতা এবং শারীরিক সক্ষমতা থাকাও জরুরী। প্রতিটি খেলোয়াড়কে মাঠে জায়গা করে নেওয়ার জন্য দ্রুততার সাথে বল নিয়ে ছুটতে হয়, যা অনেক ফুটবলারের পক্ষে সম্ভব হয়না। এবং হেভিমেটাল ফুটবলে অত্যধিক গতি ও ক্ষিপ্রতা থাকার কারণে ফাউল হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি থাকে।

ইয়ুর্গেন ক্লপ; Image Source: Getty Images

এই ফুটবল কৌশলে অন্যতম অসুবিধা হলো প্রত্যেক খেলোয়াড়কে সমানতালে খেলতে হয়। কোনো একজন সেই তাল মেলাতে না পারলে পুরো পরিকল্পনাই ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া ম্যাচে অত্যধিক মনোযোগ দেওয়ার কারণে অনেকে সময় নিজেরাই মানসিক চাপে ভুগতে শুরু করে। যার ফলাফল আরো খারাপ হতে পারে। তবে হেভি মেটালের সাথে কোনো দল মানিয়ে নিতে পারলে তাদের সাফল্য পাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। যার বড় প্রমাণ লিভারপুল। টানা দুই চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনাল খেলা চাট্টিখানি বিষয় নয়।

Featured Image: deviantart.com

The post ইয়ুর্গেন ক্লপের হেভি মেটাল ফুটবল appeared first on Khela.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *