আয়াক্সকে হারিয়ে ফাইনালে পচেত্তিনোর টটেনহাম

চলছে মে মাস। ইউরোপিয়ান ঘরোয়া ফুটবলের লিগগুলো ইতোমধ্যেই শেষের পথে। শীর্ষ ৫ লিগের মধ্যে ৩টি লিগের শিরোপা ইতোমধ্যেই নির্ধারণ হয়ে গেছে। শুধুমাত্র ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ এবং বুন্দেসলিগার শিরোপাই এখন অবধি অনির্ধারিত রয়েছে। আর এই দুই লিগের শিরোপাজয়ী দল নিশ্চিত করতে অপেক্ষায় থাকতে হবে মৌসুমের শেষ ম্যাচ অবধি। কিন্তু ঘরোয়া লিগের এই জমজমাট প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকেও উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিফাইনাল পর্ব ফুটবল ভক্তদের সবচেয়ে বেশি মাতিয়ে রেখেছে।

Image Source: Standard Uk

চলতি মাসের শুরুতে অনুষ্ঠিত হয় উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ২টি সেমিফাইনালের উভয় লেগের ম্যাচ। প্রথম ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয় লিভারপুল এবং বার্সেলোনার মধ্যে। সেই ম্যাচে ক্যাম্প ন্যুতে ০-৩ গোলের ব্যবধানে পরাজিত হলেও অ্যানফিল্ডে ফিরতি লেগে ৪-০ গোলে জয়ী হয়ে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেন ইয়ুর্গেন ক্লপের শিষ্যরা। অন্যদিকে, সেমিফাইনালের অপর ম্যাচে মুখোমুখি হয় আরেক ইংলিশ জায়ান্ট টটেনহাম এবং ডাচ চ্যাম্পিয়ন আয়াক্স।

আমস্টারডাম; Image Source: Standard Uk

ম্যানসিটিকে পরাজিত করে সেমিফাইনালে কোয়ালিফাই করে, ফাইনালে উঠার স্বপ্নে বিভোর ছিলেন টটেনহামের সমর্থকরা। কারণ এর আগে কখনো চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনার খেলতে পারেনি দলটি। যার কারণে প্রথম লেগে নিজেদের ঘরের মাঠে বড়সড় প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নামেন কোচ মাউরিসিও পচেত্তিনো। অন্যদিকে, চারবারের চ্যাম্পিয়ন আয়াক্স চলতি মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদ, জুভেন্টাসের মতো দলগুলোকে পরাজিত করে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে। যার ফলে টটেনহামের বিপক্ষে প্রথমে লেগে বেশ আত্মবিশ্বাসী হয়েই মাঠে নামে তারা।

আয়াক্সের গোলরক্ষক; Image Source: Standard Uk

লন্ডনে বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রথম লেগে ০-১ গোলে পরাজিত হয় স্বাগতিকরা। যার ফলে দ্বিতীয় লেগ নিয়ে অনেক ভক্তই আশা ছেড়ে দেন। গত ৯ মে আমস্টারডামে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় লেগের বহুলাকাঙ্ক্ষিত ম্যাচটি। আর এই বাঁচা মরার ম্যাচে উভয় দলের কোচই শক্তিশালী একাদশ মাঠে নামান। ইনজুরির কারণে দলের প্রধান তারকা হ্যারি কেনকে কোয়ার্টার ফাইনালের মতো সেমিফাইনালের উভয় লেগেই দলে নিতে পারেননি পচেত্তিনো। অন্যদিকে, প্রথম লেগের একাদশ থেকে শুধুমাত্র এক জনকে অদলবদল করে একাদশ গড়েন আয়াক্সের কোচ।

Image Source: Standard Uk

ইয়োহান ক্রুইফ স্টেডিয়ামে ম্যাচটি শুরু হয় বাংলাদেশ সময় রাত ১টায়। ম্যাচের শুরু থেকে আক্রমণ প্রতিআক্রমণ চলতে থাকে। যদিও ম্যাচের প্রথম গোলটি উপভোগ করতে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি ভক্তদের। ৫ মিনিটের মাথায় কর্নার থেকে পাওয়া বলকে অসাধারভাবে হেডের মাধ্যমে গোলে পরিণত করেন আয়াক্সের ১৯ বছর বয়সী অধিনায়ক মাথিস ডি লিগট। অতঃপর ৯ মিনিটের মাথায় অ্যারিকসেনের বাড়িয়ে দেয়া বল থেকে গোলের সহজ সুযোগ পেয়েও ব্যর্থ হন টটেনহামের মিডফিল্ডার দেলে আলি।

ডি লিগটের গোল; Image Source: Standard Uk

২২ মিনিটের মাথায় আবারো গোলরক্ষককে একা পেয়ে গোল করতে ব্যর্থ হন টটেনহামের কোরিয়ান উইঙ্গার সন। তার নেয়া গোল অভিমুখী দুর্বল শটটি খুব সহজভাবে ঠেকান আয়াক্সের গোলরক্ষক। একইভাবে সহজ সুযোগ নষ্ট করেন আয়াক্স তারকা টেডিচ। ৩১ মিনিটের মাথায় তার নেয়া শটটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে মাঠের বাইরে চলে যায়। এরপর উভয় দলই একাধিক সুযোগ তৈরি করেও গোল করতে ব্যর্থ হয়।

জিয়েচের গোল; Image Source: Standard Uk

৩৩ মিনিটের মাথায় আয়াক্সের মরোক্কান উইঙ্গার হাকিম জিয়েচের বাঁপায়ের জোরালো শটটি ঠেকাতে ব্যর্থ হন টটেনহামের গোলরক্ষক হুগো লরিস। যার ফলে ২-০ গোলে এগিয়ে যায় স্বাগতিক আয়াক্স। দ্বিতীয় গোল হজম করে গোল শোধ করতে মরিয়া হয়ে উঠে স্পার্সরা। যদিও দুই লেগ মিলিয়ে ততক্ষণে ৩-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে দলটি। অতঃপর প্রথমার্ধে আরো কোনো গোল পায়নি উভয় দল।

Image Source: Standard Uk

দ্বিতীয়ার্ধে ফার্নান্দো লরেন্তকে মাঠে নামিয়ে কৌশলগত পরিবর্তন আনেন পচেত্তিনো। আর ঠিক তখন থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ বেশ ভালোভাবেই নিয়ে নেয় তার শিষ্যরা। ৫২ মিনিটের মাথায় অ্যারিকসেনের ক্রস থেকে টেপইনে গোল করতে গিয়ে ব্যর্থ হন দেলে আলি। আয়াক্সের তরুণ গোলকিপার ওনানা বেশ শক্তহাতে আলির শটটি ফিরিয়ে দেন। এর মিনিট দুয়েক পরে মাঝমাঠ থেকে আবারো আক্রমণ সাজান দেলে আলি। তার বাড়িয়ে দেয়া বল থেকে দুর্দান্ত একটি গোল করেন লুকাস মৌরা। সেই গোলে দুই লেগ মিলিয়ে ব্যবধান ৩-১ এ কমিয়ে আনে টটেনহাম।

লুকাসের গোল উদযাপন; Image Source: Standard Uk

৫৮ মিনিটের মাথায় আবারো বড়সড় আক্রমণ রচনা করেন টটেনহামের খেলোয়াড়েরা। কিন্তু তাদের আক্রমণ রুখতে গিয়ে ভুল করে বসেন পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স উপহার দেয়া গোলকিপার ওনানা। আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আয়াক্সের জালে আরো একবার বল জড়ান লুকাস মৌরা। এতে করে গোল পার্থক্য ততক্ষণে ৩-২ এ নেমে আসে। অন্যদিকে, ব্যবধান কমায় দলকে বেশ ভালোভাবেই অনুপ্রেরণা দিতে থাকেন পচেত্তিনো। কারণ আর একটি গোল করতে পারলেই ৩টি অ্যাওয়ে গোলের সুবাধে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে উঠতে পারবে তার দল।

লুকাসের গোলের দৃশ্য; Image Source: Standard Uk

যদিও গোল ব্যবধান বাড়ানোর সহজ সুযোগ একাধিকবার হাতছাড়া করেন আয়াক্সের খোলোয়াড়েরা। ৬২ মিনিটের মাথায় লেফট উইং থেকে পাওয়া ক্রসে লক্ষ্যভ্রষ্ট শট নেন দলের দ্বিতীয় গোলটি করা হাকিম জিয়েচ। ৭০ মিনিটে আবারো স্পার্সদের রক্ষণভাগকে চুরমার করে দেন তরুণ অধিনায়ক ডি লিগট। প্রায় সমস্ত ডিফেন্ডারদের পরাস্ত করতে পারলেও হুগো লরিসকে পরাস্ত করতে পারেননি তিনি। যার ফলে আরো একবার গোলবঞ্চিত হয় আয়াক্স।

ম্যাচের দৃশ্য; Image Source: Standard Uk

৭৮ মিনিটে আবারো বড়সড় বিপদ থেকে রক্ষা পায় টটেনহাম। এবার আর হুগো লরিস দলকে বিপদমুক্ত করেননি। হাকিম জিয়েচের শটটি গোলপোস্টে লেগে ফেরত আসে। যার ফলে গোল ব্যবধান বাড়াতে পারেননি আয়াক্সের খেলোয়াড়েরা। ৮২ মিনিটের মাথায় দুইজন খেলোয়াড়কে বদলি করে কৌশলগত পরিবর্তন আনেন পচেত্তিনো। এতে করে আয়াক্সের রক্ষভাগ আরো বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, টটেনহাম একের পর এক আক্রমণ চালিয়ে যেতে থাকে।

ম্যাচের দৃশ্য; Image Source: Standard Uk

৮৫ মিনিটে কর্নার থেকে পাওয়া বলে জোরালো হেডে গোল করার চেষ্টা করেন টটেনহামের ডিফেন্ডার ইয়ান ভার্তঘেন। যদিও আয়াক্সের শক্তিশালী রক্ষণভাগকে ভেদ করতে পারেনি তার হেডটি। পরবর্তীতে আবারো বল পেয়ে শট নেন তিনি। এবারও রক্ষভাগের খেলোয়াড়দের গায়ে লেগে ফিরে আসে শটটি। ৯০ মিনিটের খেলা শেষে অতিরিক্ত আরো ৫ মিনিট যোগ করা হয়। ততক্ষণে জয় উদযাপনের জন্য প্রস্তুত হন ইয়োহান ক্রুইফ অ্যারেনার সকল সমর্থকরা।

শেষ গোলের দৃশ্য; Image Source: Standard Uk

কিন্তু তখনো ফুটবল বিধাতা এই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করেননি। ঠিক ৯৫ মিনিটের মাথায় লরেন্তের কাছ থেকে থেকে পাওয়া বলটি লুকাসকে বাড়িয়ে দেন দেলে আলি। আর বলটি পেয়েই শট নেন লুকাস। আয়াক্সের গোলরক্ষক ওনানা কিংবা ডিফেন্ডার ডি লিগট কেউই এ যাত্রায় দলকে রক্ষা করতে পারেননি। নিজের এবং দলীয় তৃতীয় গোলটি করে টটেনহামের জয় নিশ্চিত করেন লুকাস। দুই লেগ মিলিয়ে ৩-৩ গোলে ব্যবধান সমান থাকলেও ৩টি অ্যাওয়ে গোলের সুবাধে ফাইনালে কোয়ালিফাই করে টটেনহাম।

লুকাস মৌরার উদযাপন; Image Source: Standard Uk

টটেনহামের এই রূপকথার গল্পের আসল নায়ক মাউরিসিও পচেত্তিনো। চলতি মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে তাদের পথ সুগম ছিলো না। কোনোমতে গোল ব্যবধানে এগিয়ে থেকে নক আউট পর্বে কোয়ালিফাই করে দলটি। অতঃপর কোয়ার্টারে ম্যানচেস্টার সিটিকে পরাজিত করে সেমিফাইনালে উঠে টটেনহাম। আর এই দীর্ঘ যাত্রায় দলের প্রধান তারকা হ্যারি কেনকেও পাননি পচেত্তিনো। তবুও লুকাস মৌরা, সনদের নিয়ে টটেনহামকে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে তুললেন তিনি।

মাউরিসিও পচেত্তিনো; Image Source: Standard Uk

অথচ মৌসুমের শুরুতে টটেনহাম কর্তৃপক্ষ খেলোয়াড় কেনার পেছনে কোনো অর্থই ব্যয় করেননি। যেখানে ইউরোপের শীর্ষ দলগুলো শত শত মিলিয়ন খরচ করে দল গড়েন। তবুও তিনি অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখালেন। আগামী ১ জুন ওয়ান্ডামেট্রোপলিটানোতে লিভারপুলের বিপক্ষে ফাইনাল খেলবে টটেনহাম। ২০০৮ সালের পর এটিই হতে যাচ্ছে একমাত্র অল ইংল্যান্ড ফাইনাল ম্যাচ।

Featured Image: Standard Uk

The post আয়াক্সকে হারিয়ে ফাইনালে পচেত্তিনোর টটেনহাম appeared first on Khela.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *